মৃত্যুর প্রহর গুনছে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ!

হুমায়রা হেদায়েত স্বর্ণা

মৃত্যু নামক শব্দটা শুনলেই বুকের ভেতর একটা অজানা ভয়ের শূন্যতা বিরাজ করে। আর সেই মৃত্যুটা যে কারোরই হোক না কেনো!! হতে পারে সেটা কোনো জীবন কিংবা সৌন্দর্যের মৃত্যু!!
অত্যন্ত অদ্ভুত হলেও সত্য বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর  গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের মৃত্যু ঘটতে  যাচ্ছে! অনেকদিন ধরেই পরিবেশবিদরা দাবি করে আসছেন, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল ঘেঁষে থাকা গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ বা বৃহৎ প্রবাল প্রাচীর মৃত্যুর দিন গুনছে। কিন্তু, মেরিন পার্কের কর্মকর্তাদের একটি সিদ্ধান্তে এর মৃত্যুর সময় হয়তো আরও একধাপ এগিয়ে এলো।

shorna1

ব্যাপারটা তাহলে খোলাসা করেই বলি। গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রবাল প্রাচীর। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর পূর্বে অবস্থিত কুইন্সল্যান্ডের সমুদ্র তীরবর্তী প্রবাল সাগরে অবস্থিত। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ প্রায় ৯০০টি ছোট বড় দ্বীপ এবং ৩০০০-এরও বেশী প্রবাল প্রাচীর নিয়ে গঠিত। প্রায় ২০০০ কি.মি. দীর্ঘ এই প্রবাল প্রাচীর পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান এর অংশ। একে “স্বচ্ছ ও উদার সামুদ্রিক অতিবিরল রাজ্য” গণ্য করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ শুধু বিশ্বের বিখ্যাত পর্যটন স্থানই নয়, বরং এটি একটি সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক নিদর্শন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট সংকটে, সেখানকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙ্গে পড়েছে। কিন্তু পরিবেশগত কারণ যতটা না দায়ী, মানবসৃষ্ট কারণটি তার চেয়ে বহুগুণে দায়ী।

সম্প্রতি, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে ৩০ লাখ কিউবিক মিটার পলি মাটি ফেলার সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছে মেরিন পার্কটির কর্তৃপক্ষ। বিশ্বের অন্যতম বড় কয়লা বন্দর তৈরির লক্ষ্যে এই অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে চটেছেন পরিবেশবাদীরা।কারণ পলি মাটি ফেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রেট ব্যারিয়ারের বাস্তুসংস্থান।

shorna2

২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের অ্যাবট পয়েন্টের কয়লা বন্দরটি বিস্তৃত করার পরিকল্পনায় অনুমোদন দেয়। কয়লা রপ্তানির জন্য বেশ কয়েকটি কোম্পানি অ্যাবট পয়েন্ট ব্যবহার করতে চাইছে। মূলত, জাহাজ চলাচলের পথ সুগম করার জন্য পলিমাটি ফেলার সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে এই পলিমাটি প্রবাল প্রাচীরটির কোন ক্ষতি করবে না। পার্কের কর্তৃপক্ষ রাসেল রেইচেল্ট এই সিদ্ধান্তের সাফাই গেয়ে বলেন, “অ্যাবট পয়েন্টে ফেলা উপাদানে ৭০ শতাংশ বালি, ৩০ শতাংশ পলিমাটি ও কাদা। কোন বিষাক্ত পদার্থ নেই। ভবিষ্যতেও কোন অবস্থাতেই আমরা বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করবো না”।

Successtories_Greatbarrierreef
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রেলীয় সরকার বলেছে, ইউনেস্কোর উপাত্তে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে রক্ষার ক্ষেত্রে তারা চমৎকার অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ তীরবর্তী অঞ্চলের খনি শিল্পের পুঁজি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। খনি শিল্প-প্রতিষ্ঠান গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ নিকটবর্তী অঞ্চলে পোতাশ্রয় নির্মাণ করে, বর্জ্য নিষ্কাশন করে, সমুদ্রপথ সূচনা করে। ফলে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

জানুয়ারির গোড়ার দিকে সারা বিশ্ব থেকে ২৩৩ জন বৈজ্ঞানিক একটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে প্রকল্পটি বর্জন করার আবেদন জানিয়েছেন।গ্রীনপিসের তরফ থেকে লুইস ম্যাথিসন বলেন,  সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক জীবজন্তু, মত্‍স ও পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অপরদিকে, আবহাওয়ার ঘনঘন পরিবর্তন, জমি দূষণ, সমুদ্রের জলের অম্লতা বৃদ্ধি এবং প্রবালভোজী ক্রাউন অফ থর্নস স্টারফিসের বংশবৃদ্ধির ফলে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলজুড়ে ২৬০০ কিলোমিটার ব্যারিয়ার রিফ এমনিতেই বিপন্ন।  অস্ট্রেলিয়ান ইনন্সিটিটিউট অব মেরিন সাইন্স বা এইমসের গ্লেন ডাথ ও তার সহযোগীরা জানান, ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই এলাকায় হওয়া ৩৪টি ঘূর্ণিঝড় প্রায় ৪৮ শতাংশ প্রবাল ক্ষয়ের জন্য দায়ী। ৪২ শতাংশ প্রবাল বিলুপ্তির জন্য দায়ীপ্রবালখেকো স্টারফিশ। এছাড়া জলবায়ু জনিত রাসায়নিক পরিবর্তন আরও দশ শতাংশ প্রবাল ক্ষয়ের জন্য দায়ী বলে জানান গবেষকরা।

Coral_Paul_Nicklen cropped

অর্থাৎ, শিল্প উন্নয়নে মানুষের আগ্রাসন এবং পরিবেশগত বিপর্যয়  গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের জন্য মৃত্যুর গালিচা তৈরি করে দিয়েছে। আর একারণে গত ৩০ বছরে প্রায় অর্ধেক প্রবালপ্রাচীর বিলীন হয়েছে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী পূর্বাভাস দিয়েছেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, ২০২২ সালের পর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আর দেখা যাবে না।

আরো দেখান

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Verified by ExactMetrics